অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ফেলতে যাচ্ছে ফেডে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ

মুদ্রানীতি বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে দেশটির ঋণের বাজারে হিতে বিপরীত অবস্থা তৈরি করতে পারে।

মুদ্রানীতি বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে দেশটির ঋণের বাজারে হিতে বিপরীত অবস্থা তৈরি করতে পারে। আশঙ্কা প্রকশা করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি ঋণ বাবদ খরচ কমাতে সুদহার হ্রাসে ফেডকে বাধ্য করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উদ্দেশ্য অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব ফিরিয়ে আনা হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন সংকট হাজির করতে পারে। খবর এফটি।

এ বিষয়ে ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের স্টিফেন ব্রাউন বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে আমরা আবারো এমন এক বিশ্বে প্রবেশ করছি যেখানে ফেড আরো রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। এর ফলে সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুদহার ঊর্ধ্বমুখী হবে।’

এরই মধ্যে বাজারে সেই উদ্বেগের আভাস পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার দুই বছর মেয়াদি ও ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ডের ফারাক তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই দিনে ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দশমিক ২ শতাংশ দুর্বল হয়েছে ডলার।

গত অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগে থেকেই ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে আক্রমণ করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি ছিল, সুদহার কমাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্দেশে তিনি বলছেন, ‘৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সীমায় থাকা সুদহার অন্তত ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমাতে হবে।’

সম্প্রতি জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিত ফেডের বার্ষিক সম্মেলনে আগামী মাসে সুদহার কমানোর আভাস দেন জেরোম পাওয়েল, যাকে অনেকে চাপের মুখে নতি স্বীকার বলে উল্লেখ করেছেন। এর মাঝে গত সোমবার ফেড গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার উদ্যোগ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রশাসনের দাবি, মর্টগেজ আবেদনপত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন তিনি। যদিও লিসা কুকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি এবং আদালতে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।

লিসা কুককে সরানোর আগে থেকেই ফেড বোর্ডে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বসানোর দিকে এগোচ্ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি অ্যাড্রিয়ানা কুগলারের পদত্যাগের পর খালি হওয়া আসনে ঘনিষ্ঠ মিত্র স্টিফেন মিরানকে মনোনীত করেছেন তিনি। প্রথম দফায় তার আমলে নিয়োগ পাওয়া মিশেল বোম্যান ও ক্রিস ওয়ালার এরই মধ্যে সুদহার কমানোর আহ্বানে ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন।

ট্রাম্পের আক্রমণ সত্ত্বেও জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, আগামী বছরের মে মাসে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ফেড চেয়ারম্যানের পদে থাকবেন তিনি। তবে ফেডের অন্যতম গভর্নর হিসেবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পুরো মেয়াদ পূর্ণ করবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুগামীরা যদি ফেডের সাত সদস্যের বোর্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ ব্যয় বাড়তে পারে।

জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ম্যানেজার প্রিয়া মিসরার মতে, ট্রাম্প যদি বোর্ডে তার ঘনিষ্ঠদের বসাতে সক্ষম হন, তবে ফেডের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এ কারণেই ডলার ও ইল্ড কার্ভের মধ্যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কারণ চলমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে।

অবশ্য কিছু অর্থনীতিবিদ আরো গুরুতর পরিণতির আশঙ্কা করেছেন। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের মার্কিন সুদহার কৌশল বিভাগের প্রধান ব্লেক গুইন বলেছেন, ‘চলমান ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে যাচ্ছে শিগগিরই আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারি, যেখানে কার্যত প্রেসিডেন্টই মুদ্রানীতি নির্ধারণ করবেন।’

এর সঙ্গে তিনি আরো যোগ করেন, বাজারকে এখন কিছু বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সুদহারের অস্থিরতা, টার্ম প্রিমিয়াম এবং মার্কিন সম্পদের ওপর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের চাহিদা।

ফেডের বেঞ্চমার্ক ফেডারেল ফান্ডস রেট মূলত ব্যাংকগুলোর ওভারনাইট বা একদিনের জন্য নেয়া ঋণ ব্যয়কে প্রতিফলিত করে। কিন্তু ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া ঋণের গড় মেয়াদ প্রায় ছয় বছর। এর মানে দীর্ঘমেয়াদি সুদহারই সরকারি ঋণ বাবদ ব্যয়ে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে।

একসময় ফেডে কাজ করেছেন ক্লাউডিয়া সাম। বর্তমানে নিউ সেঞ্চুরি অ্যাডভাইজর্সের সঙ্গে যুক্ত এ অর্থনীতিবিদ বলছেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যয় দ্রুত বাড়তে শুরু করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটকালীন বন্ড কেনার কর্মসূচি আবার চালু করতে পারে। এতে কমতে পারে সুদহার।’

তবে অনেক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, ফেডের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। তাদের ধারণা, এ সংঘাত এক তীব্র আইনি লড়াইয়ে গড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে যাবে। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ও ফেড উভয়ই জানিয়েছে, আদালতের যেকোনো সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে তারা।

এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও ফেডের মুদ্রানীতি প্রণয়নের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকবে বলে আশা করছেন জেপি মরগানের প্রিয়া মিসরা। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি রাজনৈতিক চাহিদার বাইরের কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমবাজার ও মূল্যস্ফীতির তথ্য।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ঋণবাজারকে সুরক্ষা দিতে পারে ডলার। কারণ এটি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিস্যাধারী ও শক্তিশালী রিজার্ভ মুদ্রা। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক ব্লাইথের মতে, বিশ্বব্যাপী মার্কিন বন্ড বাজার ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য বিকল্প পথ বা নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ এখন সীমিত। কারণ অন্য কোথাও ভালো রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না।

আরও